আজ পশ্চিমবঙ্গের রূপকার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু দিবস।বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের তিনি আইকন, প্রাণপুরুষ। তিনি বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র। তৎকালীন সময়ে তাঁর পিতা ও মাতা উভয়েই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত।বাঘের সন্তানও বাঘই হয়। পিতার মত তিনিও ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও দৃঢ়চেতামানুষ। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ঘটনাবহুল, প্রচলিত ধারার বাইরে বয়ে যাওয়া স্রোতের মত। 
পিতার মত তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (১৯৩৪-১৯৩৮) হন। ১৯৩৭ সালে তদনীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুরোধ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত রচনা করে দেওয়ার জন্য। রবীন্দ্রনাথ একটির বদলে দুটি গান রচনা করে দেন - "চলো যাই, চলো যাই" ও "শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান"। "চলো যাই, চলো যাই " গানটি গৃহীত হয় এবং ১৯৩৭ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাদিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজে ছাত্রদের দ্বারা প্রথম গীত হয়।
ডঃ মুখার্জি ভারত বিভাজনের তীব্র বিরোধী ছিলেন। ডঃ মুখার্জী ফজলুল হক মন্ত্রীসভায় অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪১ থেকে ২০ নভেম্বর, ১৯৪২ পর্যন্ত কাজ করে যান। এই সময়  কাজী নজরুল ইসলাম আর্থিক অনটনের কারণে ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে ডঃ মুখার্জীর শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ডঃ মুখার্জী’র পৈত্রিক বাড়ি মধুপুরে সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা করেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য। কাজী নজরুল ইসলাম মধুপুর থেকে ১৭ জুলাই, ১৯৪২-এ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে একটা চিঠি লেখেন।  
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নেহেরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী শিল্পমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনের পর হিন্দু মহাসভাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।
ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকমোটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনার ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত।

১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার বেড়ে চলে। হত্যা, লুন্ঠন, নারীর সম্ভ্রমহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল, ১৯৫০ নেহেরু মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হয়েও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা (পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা) ও নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে লোকসভায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ডঃ মুখার্জী। অবশেষে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মৃত্যু হয়। কংগ্রেসের মধ্যে জাতীয়তাবাদী শক্তির ভর কেন্দ্রে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে অনেক চিন্তন ও মন্থন শেষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গুরুজী গোলওয়ালকারের সঙ্গে পরামর্শ ক্রমে নতুন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ভারতীয় জনসংঘ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন লাভ করে।
ডঃ মুখার্জী লোকসভায় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে বিরোধী দলের প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব দান করেন। লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নিজেকে উদাহরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
জনসংঘ ঐ সময় বিধানসভা ভোটে বাংলা প্রদেশে ৮টি আসন ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে। রাজস্থানে জমিদার প্রথা বিলোপ আইনের প্রশ্নে বিধায়করা দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ডঃ মুখার্জী রাজস্থান পরিষদীয় দলের জরুরি বৈঠক ডেকে নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের দায়বদ্ধতার কথা বলেন। ওই সভায় আটজন বিধায়কের মধ্যে মাত্র দু’জন ভৈরব সিং শেখা‍ওয়াত ও জগৎ সিং জালান উপস্থিত ছিলেন। ডঃ মুখার্জী তৎক্ষনাৎ বাকি ছ’জন বিধায়ককে বহিষ্কার করেন। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার স্বীকার করে তিনি নিজের দলকে মাত্র দুই সদদ্যের দলে পরিণত করেন।
কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে তা তিনি বারবার লোকসভার ভিতরে ও বাইরে ব্যক্ত করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সংবিধানের ৩৭০ ধারায় লেখা হয়। ‘Temporary, Transitional and Special Provision of Article 370’। সংবিধান প্রণেতা সাময়িক, পরিবর্তনমুখী ও বিশেষ কথাগুলির মধ্যে দিয়ে দূরদৃষ্টি প্রতিভাত হয়।
জম্মু-কাশ্মীরকে নিজস্ব পতাকা প্রদান করা হয়েছিল যার ফলে এই রাজ্যে প্রবেশের জন্য অনুমতির প্রয়োজন ছিল। এর বিরোধিতা করে, মুখার্জি একবার বলেছিলেন "এক দেশ মে দো বিধান, কর প্রধান প্রধানমন্ত্রী কর নিশান চ্যালেঞ্জ" (একক দেশে দুটি সংবিধান, দুটি প্রধানমন্ত্রী এবং দুটি জাতীয় প্রতীক থাকতে পারে না)।
১৯৫৩ সালে মুখার্জি কাশ্মীর সফরে গিয়েছিলেন এবং ভারতীয় নাগরিকদের রাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে এবং আইডি কার্ড বহন করার বাধ্যতামূলক আইনটির প্রতিবাদে অনশন পালন করেছিলেন। মুখার্জি জম্মু ও কাশ্মীরে যেতে চেয়েছিলেন তবে প্রচলিত অনুমতি ব্যবস্থার কারণে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। ১১ ই মে লখনপুরে অবৈধভাবে সীমান্ত কাশ্মীরে যাওয়ার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও তাঁর প্রচেষ্টার কারণে আইডি কার্ডের বিধি বাতিল করা হয়েছিল, তবে ১৯৫৩ সালের ২৩ শে জুন রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তিনি বন্দী হয়ে মারা যান।
তাঁর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক চলেছে সেই বিতর্কের এখনো নিরসন হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। কলকাতা থেকে তাঁর চিকিৎসক তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়ে ওই ইঞ্জেকশন দিতে বারণ করেছিলেন।আজ এতো বছর পরে ওই বিতর্কের নিরসন করা সম্ভব নয়। তবে তিনি যেটা চেয়েছিলেন জম্মু-কাশ্মীর থেকে বিশেষ ধারা অবসান ঘটাতে সেটা বর্তমানে সফল হয়েছে। তবে এতে করে জম্মু-কাশ্মীর ও ভারতবর্ষ উভয়ের হিতসাধন হয়েছে কারণ জম্মু ও কাশ্মীর না ছিল স্বাধীন রাজ্য না ছিল পুরোপুরি ভারতের না পাকিস্তানের। একটি রাজ্য আইনি জটিলতার মধ্যে থাকলে এবং বৃহৎ ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলে সেই রাজ্যের উন্নতি সম্ভব নয়। বর্তমানে কাশ্মীর মূল ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কাশ্মীর সন্ত্রাস মুক্ত হয়ে উন্নতির পথে চালিত হলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্ন সার্থক হবে।
তথ্য সহায়তায় উইকিপিডিয়া।