ভারত নিউজ – ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম রথ শ্রীরামপুরের মাহেশে এবছর গড়াবেনা রথের চাকা। এখন সব কিছুর পেছনে কারণ একটাই করোনা মহামারী। রথের চাকা গড়ালে একদিকে যেমন দেখা দেবে বিপুল মানুষের জমায়েত সেইসঙ্গে পরস্পর ঠাসাঠাসি হয়ে একই দড়িতে পড়বে হাজার হাজার মানুষের হাত তাই বাধ্য হয়েই এবছর বন্ধ করতে হয়েছে রথের চাকা। রথের সঙ্গে মানুষের আবেগ জড়িত রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত রাধারানী উপন্যাসে রাধারানীর সঙ্গে পদ্মলোচনের সাক্ষাৎ হয়েছিল এই মাহেশের রথের মেলায়।

মাহেশের জগন্নাথ মন্দির ও রথযাত্রা উৎসবের পিছনে একটি কিংবদন্তি রয়েছে। চতুর্দশ শতকে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক বাঙালি সাধু পুরীতে তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছা হয়েছিল যে তিনি জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন। কিন্তু পুরীর মন্দিরের পাণ্ডারা বাধ সাধায় তিনি তা করতে পারলেন না। তখন দুঃখিত হয়ে তিনি আমরণ অনশনে বসলেন। তিন দিন পরে জগন্নাথদেব তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, “ধ্রুবানন্দ, বঙ্গদেশে ফিরে যাও। সেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে মাহেশ নামেতে এক গ্রাম আছে। সেখানে যাও। আমি সেখানে একটি বিরাট দারুব্রহ্ম (নিম গাছের কাণ্ড) পাঠিয়ে দেবো। সেই কাঠে বলরাম, সুভদ্রা আর আমার মূর্তি গড়ে পূজা করো। আমি তোমার হাতে ভোগ খাওয়ার জন্য উদগ্রীব।” এই স্বপ্ন দেখে ধ্রুবানন্দ মাহেশে এসে সাধনা শুরু করলেন। তারপর এক বর্ষার দিনে মাহেশ ঘাটে একটি নিমকাঠ ভেসে এল। তিনি জল থেকে সেই কাঠ তুলে তিন দেবতার মূর্তি বানিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন।পরবর্তীকালে ১৭৫৫-এ কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক মাহেশে জগন্নাথ দেবের মন্দির তৈরি করেছিলেন যা আজও রয়েছে। বর্তমান রথটি প্রায় ১২৯ বছরের পুরনো। সে যুগে কুড়ি হাজার টাকা ব্যয়ে শ্যামবাজারের বসু পরিবারের সদস্য হুগলির দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু রথটি তৈরি করিয়ে দিয়েছিলেন। রথটিতে রয়েছে মোট বারোটি লোহার চাকা এবং দু’টি তামার ঘোড়া। ইতিহাস বলে সাধক ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী স্বপ্ন পেয়ে গঙ্গায় ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়ে দারুমূর্তি তৈরি করেন। প্রতি বছর রথের আগে বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়ে থাকে। রথের দিন জিটি রোড দিয়েই রথ টানা হয়। এই রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আজও বসে মেলা।

রথ দেখা কলা বেচা কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রথ আর কলা দুটোই এবছর বন্ধ থাকছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেশ কিছু মানুষের রুটির জোগাড় হয় কিন্তু আগে মানুষের প্রাণ তাই মানুষের প্রাণ বাঁচাতে বন্ধ করতে হয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সুদিন এলে আগামী বছর আবার গড়াবে রথের চাকা। রথের রশিতে টান দেবে লাখো মানুষ তাই আগামী বছরের অপেক্ষাতেই থাকবে সকলে। হয়তো সেদিন আবার কোনও রাধারানীর সঙ্গে দেখা হবে অন্য কোনও পদ্মলোচনের। মাঝে মাঝে সময় আমাদের পরীক্ষা নেয় সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটাই এখন আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ।

তথ্য সহায়তায় – উইকিপিডিয়া ৷