ভারত নিউজ – ৫ই জুলাই একটি স্মরণীয় দিন তবে সেটা বেদনার। একটা ৫ই জুলাই আমরা হারিয়েছিলাম প্রকৃত সমাজসেবী ও প্রতিবাদী শিক্ষককে তার নাম বরুণ বিশ্বাস। ৫ ই জুলাই এলেই বরুণ বিশ্বাসের স্মৃতি আমাদের মনে একটা বেদনার সৃষ্টি করে। কলকাতা মিত্র ইন্সটিটিউশনের বাংলার শিক্ষক, ডব্লিউ বি সি এস পরীক্ষায় পাশ করেও করেননি। প্রশাসনিক চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা ও সমাজসেবা কিন্তু নিষ্ঠুর কিছু

সমাজবিরোধীর আক্রোশে আমরা হারিয়েছিলাম এক প্রকৃত সমাজসেবী ও প্রতিবাদীকে। মহিলাদের ওপর অত্যাচার, ধর্ষণের প্রতিবাদে গড়ে ওঠে নারী নির্যাতন বিরোধী প্রতিবাদী মঞ্চ। বরুণ বিশ্বাস সেই মঞ্চ থেকেই সক্রিয় ভাবে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে সুটিয়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে একদল দুষ্কৃতিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০০০–২০০২ সালের মধ্যে ৩৩টি ধর্ষণ ও ১২টি খুনের ঘটনা ঘটেছিল সুটিয়ায়। বরুণ বিশ্বাস একদল গ্রামবাসীদের নিয়ে এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করার দাবি জানাতে থাকেন। ২০০০ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি অন্যান্যদের সঙ্গে ‘সুটিয়া গণধর্ষণ প্রতিবাদ মঞ্চ’ গঠন করেন। এই মঞ্চ ধর্ষণের প্রতিবাদে জনসভার আয়োজন করতে শুরু করে। এমনই একটি সভায় বরুণ বিশ্বাস বলেছিলেন-
আমরা যদি আমাদের মা, বোন, স্ত্রী ও মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে না পারি, তবে আমরা সভ্য সমাজে বাস করার যোগ্য নই। আমাদের যদি ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস না থাকে, তাহলে আমাদের তাদের থেকেও বেশি শাস্তি পাওয়া উচিত… তাই আসুন, আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাদের মহিলাদের সম্মান রক্ষা করুন।
বরুণ বিশ্বাসের দল ধর্ষিতাদের পুলিশে খবর দিতে সাহায্য করত, যাতে অপরাধীরা ধরা পরে। এর ফলে দলের নেতা সুশান্ত চৌধুরী ধরা পড়ে। বরুণ বিশ্বাস ধর্ষিতা মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মানসিক শক্তিও যোগাতেন।
গীতা বিশ্বাস (বরুণ বিশ্বাসের মা) বলেছিলেন – ” আমি ছেলে-হারানো এক গর্বিত মা। আমার ছোটো ছেলে বরুণ মৃত্যুভয়ের সামনে দাঁড়িয়েও কখনও পিছু হটেনি। যেদিন পর্যন্ত প্রতিবাদী মঞ্চ সবরকম দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে, সেদিন পর্যন্ত আমার ছেলে অমর থাকবে। বরুণ ছিল, বরুণ আছে, বরুণ থাকবে।”
২০১২ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে কলকাতা থেকে ফেরার পথে গোবরডাঙা রেল স্টেশনের বাইরে পার্কিং লটে বরুণ বিশ্বাসকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপরই হাবরা, গাইঘাটা ও গোপালনগর থানার পুলিশ সুটিয়া অপরাধী চক্রের পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে ছিল অভিযুক্ত ভাড়াটে খুনি সুমন্ত দেবনাথ ওরফে ফটকে, দেবাশিষ সরকার, বিশ্বজিৎ বিশ্বাস ও রাজু সরকার। এদের বেশিরভাগই স্থানীয় ছাত্র। এরা পুলিশের কাছে স্বীকার করে যে দমদম কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী সুশান্ত চৌধুরীর নির্দেশে তারা বরুণ বিশ্বাসকে খুন করেছে।
আরো অনেক সমাজসেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত ছিল বরুণ বিশ্বাস। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের বেতন থেকে বই কিনে দেওয়া, ইছামতি ও যমুনা নদীর বন্যায় প্লাবিত হত বনগাঁ, স্বরুপনগর, গাইঘাটা। বন্যা প্রতিরোধে তিনি একটি নকশা তৈরি করেন। তাঁর উদ্যোগ প্রথমদিকে রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পায়নি কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর চেষ্টাকে মান্যতা দিয়ে প্রশাসন উদ্যোগ নেয় এবং বন্যা প্রতিরোধে একটি পরিকল্পনা রূপায়ণ করে। ইহলোকে থাকলে এই বরুণ বিশ্বাসের মতো মানুষদের কাছ থেকে সমাজ আরো অনেক ভাবে উপকৃত হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বরুন বিশ্বাসের মতো মানুষদের এই সমাজ রক্ষা করতে পারেনি তবে প্রতিবাদীর মৃত্যু হয় প্রতিবাদের নয়। বরুন বিশ্বাসের প্রচেষ্টায় ওই এলাকায় নারী নির্যাতন বন্ধ করা গিয়েছিল কিন্তু সর্বত্র নারী নির্যাতন বন্ধ করা যায়নি। বন্ধ করা যায়নি বরুণ বিশ্বাসের মত মানুষের অভাবে। যেদিন সমাজে এগুলো বন্ধ হবে সেদিন বরুণ বিশ্বাসের আত্মবলিদান স্বার্থক হবে। সরকারের কাছে আবেদন পাঠ্যপুস্তকে বরুণ বিশ্বাসের মতো শিক্ষকদের সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করানো হোক যাতে একটা নতুন সমাজ তাদের হাত দিয়ে গড়ে ওঠে । বরুণ বিশ্বাসের জীবনী অবলম্বনে তৈরি হয়েছে একটি সিনেমা রাজ চক্রবর্তী প্রযোজিত’ প্রলয় ‘যাতে অভিনয় করেছেন পরমব্রত চ্যাটার্জি ।
