দুই হাজার কুড়ি সালে কেন্দ্রের জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত হল ।স্বাধীনতার পর চলে আসা জাতীয় শিক্ষানীতি থেকে এটা অনেকটাই আলাদা ।অনেকে অন্ধভাবে পুরোটা না পড়ে ,না বুঝেই বা জেনে-বুঝেই সমালোচনা করছেন। কিন্তু তারা ভুলটা কোথায় এর বিকল্প কি হতে পারে সেটা বলতে পারছেননা ।একটা নীতি প্রণয়ন হলে তার ঠিক ভুল সবরকম থাকে। ঠিক থাকলে সমর্থন করতে হবে এবং ভুলটাকে কেন ভুল তার বিকল্প কি হতে পারে সেটাকেও তুলে ধরতে হবে নাহলে স্রেফ স্বভাবগত সমালোচনায় পরিণত হয় ।এখানে ভালো দিক যেগুলো রয়েছে এমফিল তুলে দেওয়া অর্থাৎ কলেজের লেকচারার বা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হতে গেলে নেট বা সেট বা পিএইচডি হতেই হবে ।

ভারতবর্ষে একটা সামান্য কেরানির চাকরি থেকে এ গ্রেডের চাকরি পেতে গেলে লিখিত পরীক্ষা ,ইন্টারভিউ পাস করতে হয়। সেক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় অধ্যাপনা করার জন্য একটা এমফিল করে সরাসরি ইন্টারভিউ দিতে চলে যাবে এটা হতে পারেনা ।তাছাড়া এমফিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় । ভারতবর্ষের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সমান নয় একটা নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল করে কলেজে পড়ানোর ছাড়পত্র পেয়ে যাবে এটা শিক্ষার অবনমন ঘটায় তবে নতুন শিক্ষানীতিতে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য নেট বা সেট বাধ্যতামূলক করা দরকার ছিল। পিএইচডি থাকলে তার জন্য একটা নম্বর বরাদ্দ রাখলেই হতো যখন নেট, সেট পাস না করেও এমফিল-পিএইচডি থাকলে কলেজে পড়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয় তখন থেকেই একটা কথা উঠছিল এটা আসলে হার্ডল যারা টপকাতে পারেনি তাদের জন্য পেছনের দরজা খোলা হল। এই শিক্ষানীতির আরেকটা ভালো দিক হল সম্ভবত দু’বছরের বিএড পাঠ্যক্রম উঠে যাচ্ছে তার পরিবর্তে চার বছরের গ্র্যাজুয়েশন চালু হবে অর্থাৎ যারা শিক্ষকতা করতে চায় তারা একেবারে শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নিয়ে স্নাতক উত্তীর্ণ হবে ।এর ফলে বিপুল অর্থ ,সময় ও পরিশ্রম নষ্ট করে বিএড কোর্স করতে হবেনা । অনেকেই টাকার অভাবে বিএড করতে পারছিল না অনেকে জমিজমা বন্ধক দিয়ে বিএড পড়তে যাচ্ছিল এর ফলে শিক্ষার নামে ব্যবসা, বেসরকারিকরণ অনেকটা রোধ করা যাবে। দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ানোর জন্য লড়াই করতে পারবে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক উঠে গিয়ে একটাই থাকবে এবং সেটা সেমিস্টার পদ্ধতিতে পড়ানো ও পরীক্ষা করা হবে যেহেতু উচ্চশিক্ষা সেমিস্টার পদ্ধতিতে সেহেতু নবম শ্রেণী থেকেই সেমিস্টার চালু করে দেওয়া সমর্থনযোগ্য ।এতে করে ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক চাপ মুক্ত হয়ে পড়াশোনা করতে পারবে। এই নীতির আরেকটা ভালো দিক হলো কোন কারনে পড়া বন্ধ হয়ে গেলে যতদূর পড়ল তার জন্য একটা শংসাপত্র পাবে এবং পরবর্তীকালে চাইলে তারপর থেকে আবার পড়তে পারবে । উল্লেখ্য ,ভারতবর্ষে অর্থনৈতিক বা আর্থসামাজিক কারণে ছেলেরা অনেক সময় পড়া ছেড়ে কাজ করতে চলে যায় বা চাকরি করতে চলে যায় ,মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় বা অন্য কারণে পড়া বন্ধ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে পরবর্তীকালে সুযোগ এলে আবার তারা পড়তে পারবে ।ইউজিসি ও এনসিটিই মিশে গিয়ে একটি সংস্থা হবে যেহেতু আলাদা করে শিক্ষক শিক্ষণ কোর্স থাকছেনা সেহেতু এন সি টি ই রাখার দরকার নেই ।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলাদা ফি বা অতিরিক্ত ফি নিতে পারবেনা ।বিভিন্ন সময় বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে তবে শিক্ষানীতিতে উল্লেখ থাকলেও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলি সেটা মানবে কিনা না মানলে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে ,ছাত্র-ছাত্রীরা বা অভিভাবকরা অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাবে কিনা, অভিযোগ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিনা সে ব্যাপারে নিরাপত্তা দিতে হবে কারণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলি শিক্ষাব্রতী ব্যক্তিরা করেন না বড় ব্যবসায়ী বা রাজনীতিকরা প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রছাত্রীরা অনেক সময় কেরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই ভেবে প্রতিবাদ করেননা বা প্রতিবাদ করার মতো পরিস্থিতি থাকেনা ।আর্টস, সায়েন্স ,কমার্স থাকছেনা ।আর্টস এবং সায়েন্স এর মধ্যে যে একটা ইগো বা কৌলিন্যের কাজ করতো সেটা থাকবেনা ।ভোকেশনাল পড়া শুরু হচ্ছে ক্লাস সিক্স থেকে যারা মেধার দিক থেকে ততটা উন্নত নয় তারা আরো কম বয়স থেকে হাতের কাজ অর্থাৎ কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারবে ।ভারতীয় ভাষায় ই – লার্নিং ব্যবস্থা শুরু হচ্ছে ফলে অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যথাযথ সুযোগ না পেলেও বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে বিশেষ করে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেওয়ার পর কয়েক বছর পরে পুনরায় সেই পড়া সম্পূর্ণ করতে চাইলে তখন ই-লার্নিং এর সুযোগ নিতে পারবে যেহেতু ভারতীয়রা ইংরেজি ভাষায় অতোটা দক্ষ নয় তাই আঞ্চলিক ভাষা থাকছে। তবে এই শিক্ষানীতির কিছু ভুল ত্রুটি রয়েছে প্রায় ১০০ টি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতে তাদের ক্যাম্পাস খুলতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এদেশে শিক্ষাদান করতে আসবেনা তারা মোটা অর্থের বিনিময়ে শিক্ষাদান করবে এবং ডিগ্রী দেবে এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে একটা কৃত্রিম বৈষম্য সৃষ্টি হবে এবং ভারতের অর্থ বিদেশে নির্গমন হয়ে যাবে যেটা সরকারি স্কুল এবং বেসরকারি স্কুল খোলার ফলে হয়েছে। শিক্ষার অধিকার প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর সমান হওয়া উচিত না হলে দেশ যেমন প্রতিভাবান ছাত্র-ছাত্রীর প্রদত্ত মেধা থেকে বঞ্চিত হবে তেমনি দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা ধনী পরিবারের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছু হটবে। মেধার দিক থেকে নয় অর্থের দিক থেকে সেইসঙ্গে আরেকটা সমালোচনার বিষয় হচ্ছে সেই যখন চার বছরের স্নাতক ডিগ্রি করে বিএড সম্পূর্ণ করা হচ্ছে তখন ২০১৫ সালে অকস্মাৎ দু’বছরের বিএড ডিগ্রী করে কয়েক লক্ষ ছাত্র ছাত্রীর অর্থ ,শ্রম ও সময় নষ্ট করা হল কেন । একটা শিক্ষানীতি অন্তত কয়েক দশক চালু রাখতে হয় অহেতুক তাদের প্রায় দু লক্ষ টাকা খরচ করানো হল এবং কিছু বেসরকারি শিক্ষক শিক্ষণ কলেজের মালিককে ধনী করা হলো । কলা ,বিজ্ঞান, বাণিজ্য বলে আলাদা কিছু থাকবেনা সিবিএস বা চয়েস বেশ সিস্টেম চালু হলে ছাত্র-ছাত্রীরা পছন্দের বিষয় বেছে নিতে পারবে ।পদার্থ বিজ্ঞানের সঙ্গে বাংলা পড়তে পারবে কিন্তু এক্ষেত্রে একটি ছাত্র বা ছাত্রী দক্ষতার দিক থেকে কতটা উন্নত হবে কারণ পদার্থবিজ্ঞান পড়তে গেলে গণিত এবং রসায়ন লাগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস ,সঙ্গীত লাগেনা। শিক্ষা দক্ষতা এবং কর্মকেন্দ্রিক হয় কাব্যিক বা ভাবকেন্দ্রিক নয়। স্কুলে বা কলেজে সৃজনশীলতার জন্য অনেক প্রোগ্রাম রয়েছে সেখানে তাদের এই ইচ্ছেগুলো পূরণ করা যেত আবার একজন ইতিহাস নিয়ে পড়লে তার দরকার রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ভূগোলের জ্ঞান রসায়নের জ্ঞান নিয়ে আদতে কোন লাভ করতে পারবে কি ! বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তাদের রেঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে ।সরকারের অন্যান্য দপ্তরের মত স্কুল শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা একটি দপ্তর তাই প্রতিটি দপ্তর‌ই কঠোরভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার ।স্ব-শাসিত সংস্থায় সরকার চাইলেও সবক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারেনা, প্রয়োজন থাকলেও ।তাছাড়া, স্ব-শাসিত হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব হবেনা এটা জোর দিয়ে বলা যায়না অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদ দখল করে নিজের বা দলের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে। জনগণের করের টাকায় চলা যে কোন দপ্তরে জনগণের মতামত ,ইচ্ছা ,অনিচ্ছা রক্ষা পাবে যদি সরকারি নিয়ন্ত্রণ বলবৎ থাকে কারণ জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। স্ব শাসিত সংস্থার পদস্থ কর্তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়। সংস্কৃত ভাষাকে মূল ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে স্কুল স্তরে । কোন প্রয়োজন নেই ।সংস্কৃত আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গীভূত থাকলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে সেটাকে আঁকড়ে থাকলে হবেনা। প্রাচীন সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য সরকারের সংস্কৃতি দপ্তর, এশিয়াটিক সোসাইটি প্রভৃতি অনেক সংস্হা রয়েছে ।সংস্কৃত ভাষা চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রে, প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে কোন প্রয়োজন হয়না তার থেকে হিন্দি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করলে দেশে প্রতিটি ছাত্র ছাত্রী দেশের রাষ্ট্রভাষার সঙ্গে পরিচিত হত এবং চাকরির পরীক্ষায় অনেক সুবিধে হতো ।ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কেউ চাইলে ভোকেশনালে পড়তে পারবে কিন্তু প্রতিটি বাচ্চার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কমন বিষয় হিসেবে পড়াশোনা করা দরকার কারণ যে যেই পেশাতেই নিযুক্ত হন প্রত্যেকের দেশের ইতিহাস, ভূগোল এবং বিজ্ঞান ও গণিতে নূন্যতম জ্ঞান থাকা দরকার ।একজন রাজমিস্ত্রি বা কাঠের মিস্ত্রীর‌ও নূন্যতম গণিত জানা দরকার হয় সেইসঙ্গে পরীক্ষা ব্যবস্থা ফেরানো দরকার কারণ মূল্যায়ন ছাড়া কোন কিছুর অগ্রগতি নির্ধারণ করা যায়না এবং মূল্যায়ন না থাকলে যেকোন বিষয়ের গুরুত্ব কমে যায় এবং দায়িত্ব কমে যায়। তাই যে সমস্ত ভুল ত্রুটিগুলি রয়েছে সেগুলো সংশোধন করা দরকার ।এছাড়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে বেসরকারিকরণ হ্রাস করার উল্লেখ নেই শিক্ষায় বেসরকারীকরণকে বাধা না দিলে এক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নেমে যাবে ।মানুষ নিজের বাচ্চাকে ভালোভাবে মানুষ করার জন্য ও শিক্ষা দেওয়ার জন্য খাদ্য,স্বাস্থ্য, গৃহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে বেসরকারি স্কুলের ফি মেটাতে বাধ্য থাকবে । শিক্ষাকে বেসরকারিকরণ মুক্ত না করলে কি পরিনতি হয় দেখা গিয়েছে করোনা পরিস্থিতিতে । স্কুলের ফি মুকুব করা নিয়ে স্কুলের সামনে অভিভাবকদের বিক্ষোভ ,সুপ্রিম কোর্টে মামলা অবশ্য শিক্ষায় বেসরকারীকরণ বর্তমান সরকারের আমলে শুরু হয়নি অনেক আগেই শুরু হয়েছে তবে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে চালু হয়েছে বলে আমিও সেটাকে অব্যাহত রাখবো এটা কোন যুক্তি নয় । নতুন শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষা এবং আঞ্চলিক ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তবে বিদ্যালয় স্তরে প্রথম ভাষা মাতৃভাষা এবং দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি এবং তৃতীয় ভাষা হিন্দি রাখা প্রয়োজন বাস্তব নিরিখে । তাহলে একজন শিক্ষার্থীর শিশু বয়স থেকে শিক্ষা লাভ করতে যেমন সমস্যা হবেনা তেমনি আন্তর্জাতিক ভাষার সঙ্গে এবং জাতীয় ভাষার সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবে ।যেকোনো কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় সুবিধা হবে এবং পরবর্তীকালে কর্মক্ষেত্রে সুবিধা হবে ।