শিক্ষকের কাজ শিক্ষা দেওয়া তবে শিক্ষককে বলা হয় সমাজ গড়ার কারিগর কিন্তু সেই সমাজ যদি বিদেশি শাসকের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে সেক্ষেত্রে শিক্ষকের কি করা উচিত তাই প্রথাগত ডিগ্রী শেষ করার পর শিক্ষকতার কাজে যোগ দিলেও দেশমাতার শৃংখল তাঁকে ব্যথিত করেছিল সেই শিক্ষকের নাম মাস্টারদা সূর্যসেন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার ইংরেজের দখলমুক্ত করার মত দুর্ধর্ষ বিপ্লবী কাজে তিনি নিজেকে নিবেদন করেছিলেন ।ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন নামে পরিচিত তবে অধুনা দেশপ্রেমিক ভারতবাসীরা লুণ্ঠন শব্দটিতে আপত্তি জানাচ্ছেন তাই এটাকে অন্যভাবে উল্লেখ করা হলো । চট্টগ্রাম তখন ভারতের অঙ্গ বিদেশি শাসক জবরদখল করেছিল আর ওই অস্ত্র সেতো ভারতবাসীর রাজস্ব থেকেই ক্রয় করা তাহলে লুণ্ঠন হবে কেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে বহু বিপ্লবী আত্মত্যাগ করেছেন । সূর্যসেন পেশায় শিক্ষকতা করতেন তাই তাঁর নামকরণ হয়েছে মাস্টারদা সূর্য সেন । তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন এবং চট্টগ্রামে ফিরে এসে ব্রাহ্ম সমাজের প্রধান আচার্য্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ানবাজারে বিশিষ্ট উকিল অন্নদা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত অধুনালুপ্ত ‘উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে’ অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এসময় বিপ্লবী দলের সাথে তার সম্পর্ক গভীরতর হয়ে ওঠে এবং শিক্ষকতা করার কারণে তিনি ‘মাস্টারদা’ হিসেবে পরিচিত হন।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে জড়িত ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাকামী অসীমসাহসী বিপ্লবীরা। এই বিপ্লবীদের নেতৃত্বে ছিলেন মাস্টারদা সূর্যসেন। সূর্য সেন ছাড়াও এই দলে ছিলেন গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল ,অম্বিকা চক্রবর্তী ,তারকেশ্বর দস্তিদার ,নির্মল সেন ,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত ,পুলিন চন্দ্র ঘোষ সহ আরো কয়েকজন। এদের সাথে সুবোধ রায় নামে ১৪ বছরের এক বালকও ছিলেন।

কয়েক দিন পরে, পুলিশ বিপ্লবীদের অবস্থান চিহ্নিত করে। চট্টগ্রাম সেনানিবাস সংলগ্ন জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া বিপ্লবীদের কয়েক হাজার সৈন্য ঘিরে ফেলে ২২ এপ্রিল ১৯৩০ সালে।

দুই ঘণ্টার প্রচন্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৭০ থেকে ১০০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন শহীদ হন। জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে অংশ নিয়ে পলায়ন করতে সক্ষম হলেও পরবর্তীকালে পুলিসের আক্রমণে দুজন শহীদ হন ।

সূর্য সেন গৈরলা গ্রামে ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ সালে, রাতে সেখানে বৈঠক করছিলেন কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাসগুপ্ত। পুরস্কার টাকা বা ঈর্ষা, বা উভয়ের জন্য, ব্রজেন সেনের সহোদর নেত্র সেন সূর্য সেনের উপস্থিতির খবর পুলিশকে জানিয়ে দেয়। সেখানে অস্ত্রসহ সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন ধরা পড়েন। কিন্তু নেত্র সেন টাকা পাওয়ার আগেই বিপ্লবীরা তাকে মেরে ফেলে।

১২ জানুয়ারি ১৯৩৪ সালে তারকেশ্বর দস্তিদারসহ সূর্য সেনকে ব্রিটিশ সরকার ফাঁসি কার্যকর করে। সূর্য সেনকে ফাঁসি দেওয়ার আগে তার দাঁতগুলো হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় ,নখ উপড়ে ফেলা হয় শরীরের জয়েন্ট গুলিতে ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়া হয় জ্ঞানহীন অবস্থায় ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এরপর মৃতদেহ বাড়ির লোককে দেওয়া হয়নি মাঝ সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়্ দেশের স্বাধীনতা এমনি আসেনি ।সেদিন তিনি শিক্ষকতা পেশা নিয়ে খুব ভালোভাবেই সংসার করতে পারতেন কিন্তু তিনি অন্যপথের শিক্ষক তাই আজ শিক্ষক দিবসের দিন এই মহান শিক্ষক তথা মহান বিপ্লবী ও আত্মত্যাগীর নামটি স্মরণ করা একান্ত প্রয়োজন ।সেইসঙ্গে স্বাধীনতার পর আত্মত্যাগ করা বিপ্লবীরা যথাযথ সম্মান পায়নি বর্তমান সরকার বিপ্লবীদের যাতে যথাযথ মর্যাদা দেয় সেটা দেখতে হবে কারণ আত্মত্যাগ ছাড়া ও সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ছিনিয়ে না নিলে ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না।

তথ্য সহায়তায় – উইকিপিডিয়া ।