সেলুনে গিয়ে দেখলাম প্রচুর ভিড় , দাদা , কতক্ষন লাগবে চুল দাড়ি দুটোই কাটবো । হয়ে যাবে একটু বসুন , কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন । খবরের কাগজটা একটু পড়ুন । অধুনা ভিড় আছে পকেটে মোবাইল আছেতো টাইম পাস করার জন্য আর না হলে একটু ঘুরে পরে আসছি , আমার লাইনটা থাকলো । ভাবনা থাকলে আর ইচ্ছে থাকলে এর বাইরে নতুন কিছু করা যায় । ছোট্ট একটি ঘরে আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনী থেকে শুরু করে রয়েছে তামিল ও ইংরেজি ভাষায় প্রায় আটশ বই। সৃজনশীল ছাড়াও রয়েছে মননশীল বই। আপনি হয়তো ভাবছেন এটি একটি লাইব্রেরি। হ‌্যাঁ, লাইব্রেরি বটে, তবে এর অবস্থান একটি সেলুনের ভেতরে। শহরের অন‌্য দশটা সেলুনের সঙ্গে পার্থক্যটা হচ্ছে, সেখানে একটি মিনি লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়েছে। তাও আবার গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে। গ্রাহক এই লাইব্রেরির কোনো বই তিরিশ মিনিট পড়লেই মেলে চুল কাটায় ডিসকাউন্ট ।
লাইব্রেরি সুবিধাযুক্ত সেলুনের নাম ‘সুশীল কুমার বিউটি সেন্টার’। ভারতের দক্ষিণ তামিলনাড়ুর পোর্ট সিটির থুটুকুড়ি এলাকায় অবস্থিত এই সেলুনের মালিক সাঁইত্রিশ বছর বয়সি পন মারিয়াপ্পান। তিনি নিজে পড়াশোনা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। তবে পড়ার আগ্রহ এখনও তার যায়নি। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেকেরই বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে সেলুনেই লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি বই পড়ায় উৎসাহিত করতে দিচ্ছেন মূল্যছাড়।
গরিব হওয়ায় ১৯৯৬ সালে স্কুল ছেড়েছেন মারিয়াপ্পান। এরপর আঠেরো বছর নানা ধরনের কাজ করেছেন। ২০১৪ সালে পারিবারিক এই পেশায় যুক্ত হন। প্রথমে তিনি মাত্র দশটি বই নিয়ে সেলুনে মিনি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। এর আরেকটি কারণ ছিল গ্রাহক যেন কোয়ালিটি টাইম কাটাতে পারেন। অপেক্ষা করে বিরক্ত হওয়ার বদলে যেন বই পড়ে সময় কাটান। আমাদের দেশে যে কারণে অধিকাংশ সেলুনে দৈনিক পত্রিকা রাখা হয়‌ কোথাও টিভি রাখা হয় । পাঁচ বছর পর সেই মিনি লাইব্রেরিতে এখন বইয়ের সংখ্যা আটশ ছাড়িয়েছে। তরুণদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে মারিয়াপ্পানের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে থুটুকুড়ির সাংসদ থেকে শুরু করে পাবলিক লাইব্রেরির কর্মকর্তারা তার সেলুন পরিদর্শন করেছেন।
ডেকান হেরাল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মারিয়াপ্পান বলেন, ‘সবচেয়ে দারুণ বিষয় হলো আমার দোকানে যারা আসেন, তারা মোবাইল ফোন বাসায় রেখে আসেন। অনেক অভিভাবক সন্তানকে আমার দোকানে পাঠায় যেন বই পড়ায় কিছুটা সময় কাটাতে পারে।’
শুধু বই নয়, সেলুনের দেওয়ালে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণামূলক উক্তিও টাঙানো রয়েছে। মারিয়াপ্পান জানান, কিশোর বয়সে তার বই পড়ার সুযোগ হয়নি। কারণ তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। আর পরবর্তী সময়ে কাজের জন্য চাকরি করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে আমি বই পড়া শুরু করি। আমার মনে হয়, বই মানুষকে অনেক কিছু শেখায় এবং জ্ঞানের দিক দিয়ে আরো বেশি সমৃদ্ধ করে। এ কারণেই আমি সেলুনে একটি মিনি লাইব্রেরি স্থাপন করে বই পড়ায় মনোনিবেশ করেছি। আমি চাই গ্রাহকও পড়াশোনায় মনোযোগী হোক। ’
মারিয়াপ্পান সেলুনে একটি রেজিষ্ট্রার খাতা রেখেছেন, যেন শিক্ষার্থীরা তাদের নাম এন্ট্রি করার পাশাপাশি যে বই পড়েছে সেই বই সম্পর্কে দু’কথা লিখে রাখে। এবং লাইব্রেরি সম্পর্কে কোনো পরামর্শ থাকলে সেটাও উল্লেখ করে।

তাঁর এই অবাক কান্ড দেখে বোঝা যাচ্ছে শুধুমাত্র খরিদ্দারের টাইম পাস করার জন্যই আস্তো গ্রন্থাগার বানিয়েছেন তা নয় মানুষকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও তাঁর উদ্দেশ্য । এই কারণে বই পড়লে পাওয়া যায় চুল কাটায় ডিসকাউন্ট। ইন্টারনেটের যুগে গ্রন্থাগার ক্রমশ ব্যাকডেটেড পর্যায়ে পরিণত হতে চলেছে । গ্রন্থাগারে গ্রাহকদের যেমন আগ্রহ নেই, সরকারের গ্রন্থাগারিক নিয়োগ ও নতুন গ্রন্থাগার তৈরিতেও বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই অথচ একটা কথা আছে যে জাতির মানুষ যত বেশি বই পড়েন সেই জাতি ততো বেশি শিক্ষিত । গ্রন্থাগার একটা জাতির সভ্যতা সংস্কৃতিকে বহন করে চলে তাই ইন্টারনেটের যুগে গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দরকার। ইন্টারনেট সব কিছুর মিশ্রণ আর গ্রন্থাগার খাঁটি সংস্কৃতি ।

তবে তামিলনাড়ুর ওই নরসুন্দর ছাড়াও আরো এক দুজন ব্যতিক্রমী নরসুন্দর রয়েছেন যারা সেলুনে গড়ে ফেলেছেন গ্রন্থাগার । বাংলাদেশে রয়েছে এরকম নরসুন্দর । ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি গড়ে আলোচনায় এসেছেন খুলনার বটিয়াঘাটা বাজারের সেলুনের মালিক মিলন শীল। মিলন শীলের বাড়ি ওই উপজেলার হেতালবুনিয়া গ্রামে। তিনি যে সেলুনে কাজ করেন ১৯ বছর আগে ওই সেলুনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার বাবা। আর ১৩ বছর আগে বাবার হাত ধরে ওই সেলুনের দায়িত্ব নেন মিলন। মিলন বলেন, নিত্যনতুন বইয়ের জন্য পড়ুয়ারা তার সেলুনে আসেন। ইন্টারনেটের এ যুগেও তার লাইব্রেরিতে বই পড়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এলাকার অনেকেই বই কিনে পড়তে পারেন না। তাদেরও চাহিদা মেটাচ্ছে এই লাইব্রেরি। তিনি বলেন, তার লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ছোট-বড় বিভিন্ন লেখকের শোভা পাচ্ছে তিনশটিরও বেশি বই। কিছু বই মিলন নিজ উদ্যোগে কিনেছেন। আর কিছু বই বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। সেলুনে কেউ চুল কাটতে বা অন্য কোনো কাজে আসলে সময় কাটানোর জন্য তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয় বই। সেখানে বসেই বই পড়া যায়। আবার চাইলে একটি খাতায় নাম, ঠিকানা লিখে বই বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন পাঠক।