অমূল্য আগাছা – আয়াপান – সৌরেন্দুশেখর বিশ্বাস ।

কত সহজলভ্য, কত সহজে একে চাষ করা যায়! অথচ এর অসামান্য গুণাবলী ও ব্যবহারবিধি না জানার জন্য আয়াপান আজ আমাদের কাছে অচেনা আগাছায় পরিণত হয়েছে। বাড়ির উঠোনে অথবা ভিজে টবেই এই অতি প্রয়োজনীয় ভেষজটি আমরা রাখতে পারি।আসুন,আজ আয়াপান সম্পর্কে দু-চার কথা জেনে নিই। এটি আদতে ল্যাটিন আমেরিকার গাছ। ভারতের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে, বিশেষত দুই বঙ্গের ভিজে স্যাঁৎসেতে ছায়াচ্ছন্ন জমিতে ভাল বৃদ্ধি পায়। ছোট গুল্ম জাতীয় গাছ মাটির ওপর লতিয়ে বাড়ে। পাতা তেজপাতার ধরনের, সরস, নরম‌ ও শিরাগুলো খয়েরি লাল, কান্ড‌ও খয়েরি। মাটিতে পড়ে থাকা কান্ডের কক্ষ থেকে শিকড় বের হয়।এই শিকড়যুক্ত কান্ড বুনে দিলেই নতুন গাছ হয়। ফুল ছোট্ট, বেগুনী রঙের। বৈজ্ঞানীক নামঃ Eupatorium ayapana / E. triplinerve ( Composites / Asteraceae ) গুনাগুণ ও ব্যবহার বিধি - সাধারনভবে টাটকা আয়াপান পাতাই ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়। অভাবে শুকনো গাছ চূর্ণ করেও ব্যবহার করা যায়। আয়াপান পাতা রক্তরোধক, রক্তবর্ধক ও রক্তশোধক এবং স্নায়ূতন্ত্রের উত্তেজক। বড় অসুখে ভোগার পর অপুষ্টির জন্য অথবা অন্য কোন কারনে রক্তহীন হয়ে পড়লে বা রক্তচাপ খুব কমে গেলে আয়াপান পাতার রস ৩০ মিলি সামান্য আখের গুড় বা চিনি মিশিয়ে বা দুধের সঙ্গে নিয়মিতভবে কয়েকদিন সকালে খালিপেটে খেলেই সুফল পাবেন। ব্যবহার করলেই বুঝতে পারবেন, বাজারচালু যে কোন ফুল সাপ্লিমেন্ট কিংবা টনিকের থেকে এটি বেশি কার্যকরী ও দীর্ঘস্থায়ীভবে ফলপ্রসু। রক্ত আমাশায় আয়াপানের রস ১০ মিলি দিনে দু- বার খালিপেটে সামান্য চিনি বা বাতাসা সহ ৩-৪ দিন খেলেই রোগ ভাল হয়ে যাবে। অর্শরুগীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এক‌ই পরিমানে পাতার রস এক কাপ ঠান্ডা দুধের সাথে মিশিয়ে দিনে দু-বার খেতে হবে রক্ত বন্ধ হয়ে যাবার পর‌ও বেশ কিছুদিন। নাক দিয়ে রক্তপড়া, ও শরীরের ভেতরের রক্তক্ষরণে আয়াপানের রস কার্যকরী। এটি লিভারকেও সতেজ করে। গভীরভবে কেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হলে আয়াপান পাতা থেঁতো করে ক্ষতের ‌ওপর প্রলেপ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিলে কিছুক্ষনের মধ্যেই রক্ত বন্ধ হবে। তবে, গভীর ক্ষত হলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে টিটেনাস ভ্যাকসিন অবশ্য‌ই নিতে হবে এটা ভুলবেন না। পচা-দূষিত ঘা আয়াপান পাতা-ফোটানো গরম জলে অথবা পাতার রস মেশানো ঈষদুষ্ণ জলে নিয়মিত দিনে দুবার ধুয়ে পরিস্কার করলে ঘা খুব তাড়াতাড়ি ভাল হবে। আয়াপানের রস নার্ভাইন টনিকের কাজ করে, এটি হার্টের‌ও উত্তেজক। বার্ধক্যজনিত ভুলোমনভাব কমাতে সামান্য গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে ১৫-২০ মিলি রস সকালে নিয়মিত খেলে খুব ভাল ফল পাওয়া যায়। ফণাধর সাপের বিষে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র নিস্তেজ হয়ে রুগী ঝিমিয়ে পড়ে, একসময় হার্ট‌ও স্তব্ধ হয়ে রুগীর মৃত্যু হয়। কেউটে ,গোখরো, শঙ্খচূড় জাতীয় সর্পাঘাতের অব্যবহিত পরেই আয়াপানের রস ২৫-৩০ মিলি ,৫-৬টি গোলমরিচ গুঁড়ো সমেত খাওয়াতে পারলে অন্তত আ্যন্টিভেনম ইনজেকশন দেওয়ার সময়টুকু পাওয়া যাবে। তবে ,ইঞ্জকশনটা অবশ্যই দেবেন, কারণ ওটাই প্রথম ও শেষ কথা। লো ব্লাড প্রেসারের ক্ষেত্রে সকাল-সন্ধ‍্যা আয়াপানের রস ২৫-৩০ মিলি পরিমান সামান্য চিনি বা মিছরি সহ‌ এক কাপ দুধে মিশিয়ে নিয়মিত খেলে রক্তচাপ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই এক‌ই অনুপান সহ এক‌ই নিয়মে আয়াপানের রস আর‌ও একটি চমৎকার কাজ করে। এটি নিয়মিত খেলে নিশ্চিতভবে ত্বকের উজ্জ্বলতা এনে দেহের কান্তিবর্দ্ধণ করে। লোকায়তভবে আরো নানাভাবে এই অমূল্য ঔষধীটি ব্যবহৃত হয় ও হতো। আমাদের এগুলো খুঁজে বের করতে হবে– এ যে আমাদের‌ই একান্ত নিজস্ব সম্পদ ।