১৮৬৭ সালের ৭ই নভেম্বর বর্তমান পোল্যাণ্ডের ওয়ারশ শহরে জন্মগ্রহণ করা পরিবারের ছোট্ট কন্যা সন্তান মানিয়া যে ভবিষ্যতের প্রথম ও দুবার নোবেল জয়ী মহিলা বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারে তা ছিল কল্পনাতীত। কল্পনাতীত এই কারণেই, নানা প্রতিবন্ধকতা তাঁর জীবনের যাত্রাপথকে বারবার অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। সেই প্রতিবন্ধকতা শুধু যে আর্থিক দিক থেকে তা নয়, প্রতিবন্ধকতা ছিল সামাজিক-পারিবারিক এমনকি রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যবস্থাতেও। একদম ছোটবেলায় মা ও দিদিকে হারানো, বাবার চরম আর্থিক দুর্দশা সেইসাথে ছিল তৎকালীন জার শাসিত ওয়ারশ শহরে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় বাধা, বিজ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে গোপনে ভ্রাম্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, মাঝপথে পড়া থামিয়ে গভর্নেসের কাজ নিয়ে দিদিকে পড়তে পাঠানো, শেষে প্যারিসে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় পড়াশোনা শেষ করে সাফল্যের চূড়ায় উত্তরণ । তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক ও মানব জাতির কল্যাণে তাঁর অবদান- এক প্রেরণাদায়ক উপাখ্যান। এই উপাখ্যানের ছত্রে ছত্রে আমরা দেখতে পাই তাঁর মুক্তমন ও যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
মেরি কুরি জন্মগ্রহণ করেন ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসী পরিবারে। মাত্র ৯ বছর বয়সে দিদিকে ও ১১ বছর বয়সে মাকে হারাতে হয়। এই দুই মৃত্যু তাঁর জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ফলস্বরূপ মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি নিজেকে অজ্ঞেয়বাদীতে পরিণত করেন। মাদাম তখন পিয়ের কুরির সাথে গবেষণারত, এই সময় পিয়ের কুরি মেরিকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। প্রথমে রাজি ছিলেননা আমাদের মেরি, যদিও পরবর্তীতে পিয়ের তাঁর মনের মানুষ হন এবং তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর মনের মানুষ হওয়ার পেছনে কুরি সাহেবের ধর্মউদাসীনতা গুণটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হয়। মাদাম কুরি ১৯২৩ সালে লিখেছেন, তাঁর শ্বশুরমশাই অর্থাৎ পিয়ের কুরির পিতা ইউজিন কুরি ছিলেন একজন মুক্তচিন্তক ব্যক্তি, তিনি নিজে কোন ধর্ম পালন করতেননা এবং তার সন্তানদের ধর্মীয় রীতি মেনে দীক্ষিত করেননি। সেই সাথে ছোট থেকেই সন্তানদের কোনো ধরনের ধর্মাচরণের অভ্যাস তৈরি করাননি। একজন মুক্তচিন্তার অধিকারিণী এমন বিষয়গুলি যে মনে ধরবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
১৮৯৫ সালে এক অনাড়ম্বর, ধর্মীয় রীতিনীতি ব্যতীত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কুরি দম্পতি। সাধারণত ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মেরির পোশাক সাদা হওয়ার কথা থাকলেও আমরা দেখতে পাই তিনি নীলচে কালো রঙের পোশাক ব্যবহার করেছিলেন। আসলে তিনি চেয়েছিলেন এমন পোশাক যা তাঁর ল্যাবের কাজে সহায়তা করবে।
একজন মুক্তমনা ব্যক্তি বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উন্নত সমাজ গঠনেও যে এগিয়ে আসবেন এমনটাই বারে বারে দেখতে পাই। মাদাম কুরি যখন দিদিকে পড়ানোর উদ্দেশ্যে গভর্নেসের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি গোপনে ওই এলাকার গরিব চাষিদের ছেলেমেয়েদের স্বাক্ষরতার কাজ করতেন যা ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি। ধরা পড়লে শাস্তি হিসেবে সাইবেরিয়া নির্বাসন নিশ্চিত।
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে গেলেও অর্থাভাব তাঁকে তাঁর মুক্তচিন্তার আদর্শ থেকে একচুলও সরাতে পারেনি। তাইতো রেডিয়াম আবিষ্কারের পর যখন তাঁদের পেটেন্ড নেওয়ার জন্য বলা হয় তিনি বলেন, “Radium is not to enrich any one.It is an element,it is for all people.” এমন মন্তব্য করার সৎ সাহস একজন মুক্তচিন্তকেরই থাকতে পারে। পেটেণ্ড নিলে শুধু দারিদ্র্য দূর হত তা নয়, বর্তমান বাজারনির্ভর ব্যবস্থাপনায় তিনি যে বিপুল সম্পত্তির অধিকারিণী হতেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
মেরি কুরিকে মুক্তমনা হবার খেসারত দিতে হয়েছে নানাভাবে। একে তিনি মহিলা, তার ওপর মুক্তমনা ও যুক্তিবাদী। তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজে কি চরম লাঞ্ছনা স্বীকার করতে হয় তার উদাহরণ ১৯১১ সালে ফ্রেঞ্চ অ্যাক্যাডেমি অফ সায়েন্সেস সদস্যপদের মনোনয়ন পর্বের ঘটনাটি। অল্পের জন্য তিনি সদস্যপদে মনোনীত হননি। সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে দক্ষিণপন্থী মিডিয়া অভিযোগ এনেছিলেন মাদাম কুরি ছিলেন নাস্তিক এবং বিদেশি। কি অদ্ভুত বিষয় দেখুন, দেশ-কাল-পাত্র পরিবর্তন হলেও মুক্তমনা, যুক্তিবাদী মানুষজনদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বারবার একই থাকে।
ইন্টারনেট ঘাঁটলে মাদাম কুরির সবচেয়ে জনপ্রিয় যে দুটি উক্তি আমরা দেখতে পাই তার প্রথমটি হল, “Be less curious about people and more curious about ideas.”
দ্বিতীয়টি হল, “In science, we must be interested in things, not in persons.”
উক্তি দুটিতে যেন সবটা বলা হয়ে যায়। সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাই তো বলতে বাধ্য হয়েছেন, বিজ্ঞান বা মানব সভ্যতার অবদান নয় মাদামের নৈতিকতা, বিচারশক্তি ও চরিত্রের দৃঢ়তা জন্য তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা করেন।
বর্তমান সময়ে চারিদিকে যখন মুক্তমনার আকাল, যুক্তিবাদের চর্চা আক্রান্ত, তখন একজন মহিলা বিজ্ঞানীর জীবনীই পারে তমসাচ্ছন্ন রাস্তায় আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে।
লেখা – শুভাশীষ ।
