আজ ২০ শে জুলাই এক বাঙালি বিপ্লবীর মৃত্যু দিবস তিনি হলেন বটুকেশ্বর দত্ত । বটুকেশ্বর দত্ত ছিলেন উনিশ শতকের শূন্য দশকের একজন বাঙালি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী এবং ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধা। ১৯২৯ সালের ৮ ই এপ্রিল ভগৎ সিংয়ের সাথে নয়া দিল্লীর কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে বোমা ফাটানোর জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তারা পরিকল্পনা মোতাবেক দুটি বোমা ফেলে যাতে কারো কোনো ক্ষতি না হয়। ফরাসী নৈরাজ্যবাদী বিপ্লবী বৈলেয়ন্টের মতোই ভগৎ সিংহের বক্তব্য ছিল ‘বধিরকে শোনাতে উচ্চকণ্ঠ প্রয়োজন’। বটুকেশ্বর দত্ত ও তিনি ইস্তাহার ছড়িয়ে দেন নিজেদের বক্তব্যের সমর্থনে, স্লোগান দেন এবং শান্তভাবে গ্রেপ্তারবরণ করেন।
‘আমি তো এক’
( শ্রদ্ধায় ও স্মরণে বটুকেশ্বর দত্ত )
সে তখন অনেকদিন আগের কথা,এক তরুণ বিপ্লবীর স্মৃতিচারণায় ভেসে উঠলো ফেলে আসা দিনগুলোর কথা,যখন তিনি এবং তার প্রিয় ‘সর্দার’ কানপুরে রয়েছেন , যে বাড়ীটিতে তারা থাকতেন সর্দার কাপড় কাচতে কাচতে একটা গানের দু লাইন গুন গুন করতেন ‘আমি তো এক’ ।
তরুণ বিপ্লবীটি আরোও জানাচ্ছেন যে তখন সবেমাত্র ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন ‘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বেশ কিছু তরুণ তাতে যোগ দিয়েছে । এদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র পথে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করা । শচীন্দ্রনাথ সান্যাল,যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জি,রামপ্রসাদ বিসমিল,আশফাকউল্লা খান প্রমুখেরা ছিলেন এই দলের মাথা । তরুণ বিপ্লবীটি এদের দলেই যোগদান করে তার প্রিয় ‘সর্দার’ আসেন অনেক পরে ।
যাইহোক , ১৯২৫ সালের ৯ ই আগষ্ট কাকোরী স্টেশন থেকে কিছুদূরে আটজন বিপ্লবী আশফাকউল্লা খানের নেতৃত্বে ৮ নং ডাউন প্যাসেঞ্জার ট্রেন থেকে সরকারী অর্থ লুঠ করে বিপ্লবের কাজে অস্ত্র কেনার জন্যে ,ইংরেজ সরকার চিরুণী তল্লাশী চালিয়ে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মোট চুয়াল্লিশ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে শুরু করে ‘কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলা ‘|
এদিকে কাকোরী ষড়যন্ত্র মামলা দলকে প্রায় নিঃশেষ করে দেয় তখন চন্দ্রশেখর আজাদ ও সর্দার এগিয়ে আসেন দলকে নতুন করে গড়ে তুলতে ।
১৯২৮ সালের ৮ ও ৯ ই সেপ্টেম্বর দিল্লীর ফিরোজ শাহ কোটলা মাঠে সর্দার (এই সর্দার হলেন শহিদ ই আজম ভগৎ সিং ) নতুন করে দলকে গড়ে তোলে এবং সমাজতান্ত্রিক পথে দলের নতুন নাম দেন ‘হিন্দুস্থান সোস্যালিষ্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন’ |
অন্যদিকে ১৯২৯ সালে সরকারী দমননীতি চরমে ওঠে, আচমকাই ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে ৩৩ জন কমিউনিষ্ট নেতাকে গ্রেপ্তার করে ‘মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা’ শুরু করে । ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিক ধর্মঘট ও বিক্ষোভ চরমে ওঠে তখন ইংরেজ সরকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে আঘাত করতে ‘ট্রেড ডিসপিউট ও পাবলিক সেফটি বিল ‘ নামে দুটি অতি স্বৈরাচারী বিল পাশ করে |
এর বিরুদ্ধে হিন্দুস্থান সোস্যালিষ্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । ভগৎ সিং মূলত নিয়েছিলেন মুখ্য ভূমিকা তিনি আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন যদিও বোমা দুটি ছোঁড়া হবে কাউকে হত্যা করতে নয় বরং বিদেশী স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিজেদের কথা শোনানোর জন্য |
একাজের জন্য ভগৎ সিং ও সেই তরুণ বিপ্লবীকে বেছে নেওয়া হয় তারা একমাস দিল্লীতে ছিলেন । এই দিল্লীতে থাকাকালীন এক সুন্দর স্মৃতিচারণ করেছেন সেই তরুণ বিপ্লবী(এই তরুণ বিপ্লবী ছিলেন বর্ধমানের খন্ডঘোষ গ্রামের ছেলে বটুকেশ্বর দত্ত)|
“খাওয়ার পরে সর্দার আমার সামনে এক গ্লাস ভর্তি দুধ নিয়ে আসতো,ভরপেট খাবার পরে এক গ্লাস দুধ আমার পেটের পক্ষে হজম করা সম্ভব ছিলোনা কিন্তু সর্দার বলতো খাও ,তোমায় খেতেই হবে” ।
আরোও বলেছেন তিনি যে সর্দারের দুধের সঙ্গে মোটা সরের প্রতি খুব আকর্ষণ ছিলো কিন্তু সর না থাকলে দুধে ঘি মিশিয়ে নিতো ।
যাইহোক ১৯২৯ সালের ৮ ই এপ্রিল ভগৎ সিং ও তরুণ বিপ্লবীটি দিল্লীর আইনসভায় বোমা নিক্ষেপের পরে ধরা দেন এবং দুজনকেই একমাস দিল্লী জেলে রাখা হয় পরে ৬ ই জুন তাদের দিল্লী সেশ্যান আদালতে উপস্থিত করা হয় এবং ১২ ই জুন উভয়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ।
এদিকে , ভগৎ সিং , বটুকেশ্বর দত্তকে প্রথমে মিঁয়ানওয়ার জেলে পাঠানো হয় এবং ১৫ ই জুন থেকে এখানেই তারা ঐতিহাসিক অনশন শুরু করেন পরে দুর্ভাগ্যবশত সাহারানপুরে দলের বোমা কারখানা থেকে একাধিক বিপ্লবী গ্রেপ্তার হলে তাদের সবাইকে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে আনা হয় এবং ১০ ই জুলাই ১৯২৯ থেকে তাদের বিরুদ্ধে লাহোরের পুঞ্চ হাউসে দ্বিতীয় লাহোর মামলা শুরু হয় ।
৭ ই অক্টোবর ১৯৩০ সালে লাহোর মামলার রায় অনুযায়ী ভগৎ সিং,সুখদেব,রাজগুরুকে ফাঁসীর আদেশ দেওয়া হয় এবং শিব বর্মা,গয়াপ্রসাদ,অজয় ঘোষ,জয়দেব কাপুর,কমলনাথ তেওয়ারী,বটুকেশ্বর দত্তদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড ও সেলুলার জেলে পাঠানো হয় ।
সেলুলার জেলে থাকাকালীন বিপ্লবীদের উপর প্রচন্ড অত্যাচারের ফলে বটুকেশ্বর দত্ত গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিনি ভারতে ফিরে আসেন ।
আর্থিক অনটনের সম্মুখীন এই মহান বিপ্লবী শেষপর্যন্ত পরিবহনের ব্যবসায় নামতে বাধ্য হন দুমুঠো ভাতের যোগানের জন্য ।
একটা সময় তিনি যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং ১৯৬৫ সালের ২০ শে জুলাই দিল্লীর হাসপাতালে সবার অজ্ঞাতসারে এই মহান বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে, বর্ধমান স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে বটুকেশ্বর দত্তের নামে করার চেষ্টা চলছে ।
সর্দারের প্রিয় ‘বটুকে’ মনে রেখেছিলেন একজনই আর তিনি হলেন ‘শহিদ ই আজম’ ভগৎ সিং এর মাতা বিদ্যাবতী দেবী ।
মূলত তাঁরই ইচ্ছানুসারে ফিরোজপুরে ভগৎ সিং এর সমাধির পাশেই বটুকেশ্বর দত্তের সমাধি নির্মাণ করা হয়েছে ।
আজ বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্তের ৫৬ তম প্রয়াণদিবসে তাঁকে জানাই প্রণাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলি ।

